![]() |
| এ আই দ্বারা নির্মিত ছবি |
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গত কয়েক মাসে ঘটে যাওয়া পালাবদলকে কেন্দ্র করে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ উঠে আসছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন গোষ্ঠী বা ‘ইনার সার্কেল’ ধীরে ধীরে ভেঙে দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর পরিকল্পিত প্রভাব ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সূত্র এমনই ধারণা প্রকাশ করছে।
‘ইনার সার্কেল’-এর গঠন ও শক্তি
২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় দেড় যুগ ক্ষমতায় থেকে শেখ হাসিনা নিজের চারপাশে একটি দৃঢ় আস্থার বলয় তৈরি করেছিলেন। এর ভেতরে ছিলেন—
-
কয়েকজন বিশ্বস্ত মন্ত্রী ও দলীয় কৌশলবিদ
-
প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা
-
নীতিগতভাবে ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যবসায়ী ও উপদেষ্টা
এ বলয়কে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক টিকে থাকার প্রধান শক্তি হিসেবে দেখা হতো।
ভাঙনের কৌশল: মার্কিন ডিপ স্টেটের ভূমিকা
আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে, এই বলয় ভাঙতে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি কৌশল নিয়েছিল—
-
কূটনৈতিক চাপ ও মানবাধিকার ইস্যু
গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রশ্নে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। মার্কিন ভিসা নীতি এবং বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা শুধু সরকারের ওপর নয়, বরং নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপরও চাপ বাড়িয়ে তোলে। এতে আস্থাভাজনদের অনেকেই নীরব অবস্থান নিতে শুরু করেন। -
ব্যক্তিগত টার্গেটিং ও অর্থনৈতিক চাপ
কিছু ব্যবসায়ী ও আমলা, যাদের ওপর শেখ হাসিনা নির্ভর করতেন, তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ লেনদেন বা বিদেশে সম্পদ গোপনের অভিযোগ তোলা হয়। এতে তারা আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নেন এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। -
অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে কাজে লাগানো
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের ভেতরে গোষ্ঠীবাজি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছিল। মার্কিন কূটনীতিকরা এ প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও উস্কে দিয়ে দলের ভেতর বিভক্তি গভীর করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও বাংলাদেশ
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব পুনর্গঠন।
-
ভারতের ভারসাম্য: ভারতকে এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করতে না দিয়ে বাংলাদেশকেও প্রভাব বলয়ের ভেতর রাখতে চেয়েছে ওয়াশিংটন।
-
চীনা প্রভাব ঠেকানো: শেখ হাসিনার সময়ে চীনের সঙ্গে অবকাঠামোগত সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল।
-
ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল: যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কৌশল বাস্তবায়নে শেখ হাসিনার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ‘বাধা’ হয়ে দাঁড়ায়।
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে প্রতিক্রিয়া
আওয়ামী লীগের অনেক নেতা মনে করেন, শেখ হাসিনার পতনের প্রধান কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ ঐক্যের ভাঙন।
একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন— “আমরা ভেতর থেকে ভেঙে গেছি। বাইরের চাপ যদি থাকতও, শক্ত ইনার সার্কেল থাকলে এত দ্রুত পরিবর্তন হতো না।”
ভবিষ্যতের প্রেক্ষাপট
বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দেশ চলছে। আওয়ামী লীগ নতুন করে পুনর্গঠন ও কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত। দলের একাংশ মনে করছে—
-
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন অসম্ভব নয়, তবে তার জন্য আন্তর্জাতিক লবিং শক্তিশালী করা দরকার।
-
নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে এনে দলের ভাবমূর্তি সংস্কার করতে হবে।
-
মার্কিন ডিপ স্টেটের প্রভাব মোকাবিলায় বিকল্প কূটনৈতিক ভারসাম্য তৈরি জরুরি।
উপসংহার
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলকে শুধু অভ্যন্তরীণ সংকট দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ, এ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে—এমন বিশ্লেষণ দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার পতন যে শুধু বাইরের চাপ নয়, বরং ভেতরের আস্থাভাজন বলয়ের ভাঙনের ফলাফল—এ ধারণাই এখন বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
সূত্রঃ NORTHEAST NEWS









Leave a Reply